
শচীন্দ্র নাথ মন্ডল দাকোপ (খুলনা) প্রতিনিধি
খুলনার দাকোপ উপজেলার খাল-বিল ও জলাশয়ে নিষিদ্ধ জাল ‘চায়না দুয়ারি’ দিয়ে নির্বিচারে ছোট-বড় মাছ শিকারের অভিযোগ পাওয়া গেছে। নিষিদ্ধ এ জালের ব্যবহারে এখন আর মিলছে না আশানুরূপ দেশি মাছ। এতে বিপাকে পড়েছেন মাছ শিকারের ওপর নির্ভরশীল পেশাজীবী জেলেরা। নিষিদ্ধ জাল দিয়ে অবাধে মাছ শিকার করায় এ অঞ্চলে প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত দেশীয় মাছের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত সচেতন মহল।স্থানীয় পেশাদার জেলেদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা এ জাল ব্যবহার করেন না, কারণ এতে মা ও পোনা মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তবে অপেশাদার জেলেরা সহজ লাভের আশায় ব্যাপক হারে এই জাল ব্যবহার করছেন।পরিবেশকর্মীদের অভিযোগ, ‘চায়না দুয়ারি’ জালটি নিষিদ্ধ হলেও থেমে নেই এর অবাধ বিপনন আর ব্যবহার। যার ফলে এই জালের অধিক ব্যবহারে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে দেশীয় প্রজাতির মাছ আর জলজপ্রাণী। কারেন্ট জালের থেকেও বিপজ্জনক, চায়না দুয়ারি জল বিক্রি ও ব্যবহার বন্ধে নির্বিকার স্থানীয় মৎস্য দপ্তর।সরেজমিন কয়েকটি এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, চলতি বর্ষা মৌসুমে ব্যাপক হারে ভয়ংকর এ জাল ছড়িয়ে পড়েছে বিভিন্ন খাল-বিল ও জলাশয়ে। কোথাও কোথাও অল্প পানিতে জাল পেতেছেন শিকারীরা। কোথাও দেখা যায়, অর্ধেক পানির নীচে অর্ধেক ডাঙ্গায়। হালকা ও সরু বুননের ছোট ফাঁসের লম্বা জালে ধরা পড়ছে নানা প্রজাতির দেশীয় ছোট-বড় মাছ। বাদ যাচ্ছে না জলজ প্রাণীও। মারা পড়ছে প্রকৃতির উপকারী ব্যাঙ, সাপ, কুচিয়া, শামুক, কাঁকড়াসহ নানা জাতের পোকা-মাকড়।উপজেলা সদরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া চালনা খালে ৩০ বছর ধরে মাছ শিকার করেন ছোট চালনা গ্রামের জেলে আফজাল শেখ। তিনি বলেন, চায়না দুয়ারি জাল ব্যবহারের কারণে বর্ষা মৌসুমে দেশী মাছের প্রজননে ব্যাপক বাধা হচ্ছে। খালে খেওয়া জাল ফেললেই চায়না দুয়ারি জালে জড়িয়ে যাচ্ছে। এই জালে মাছের পোনা থেকে শুরু করে ছোট মাছগুলোও অবাধে নিধন হচ্ছে। এভাবে খাল-বিলে চায়না দুয়ারির ব্যবহার বাড়তে থাকলে আগামীতে চালনা খালসহ অন্যান্য খালেও দেশীয় প্রজাতির মাছ পাওয়া যাবে না।বনলাউডোব এলাকার জেলে পংকজ মণ্ডল বলেন, আমরা পৈতৃক পেশায় মাছ ধরি। পোনা ও মা মাছ বাঁচলেই মাছের বিস্তার হবে, তাই আমরা সেগুলো কখনো ধরি না। কিন্তু অপেশাদার জেলেরা অবৈধ জাল দিয়ে নির্বিচারে শিকার করছেন। এই জাল দেশি মাছের বংশই ধ্বংস করে দিচ্ছে। আইনের কঠোর প্রয়োগ ছাড়া এ জাল বন্ধ করা সম্ভব নয়। তা না হলে কয়েক বছরের মধ্যে জলাশয়গুলো থেকে দেশি মাছ পুরোপুরি হারিয়ে যাবে। এতে আমাদের জীবিকা মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে।উপজেলা জ্যেষ্ঠ মৎস্য কর্মকর্তা মো. আবুবকর সিদ্দিক বলেন, চায়না দুয়ারি জাল সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ। মৎস্য আইনে এটির বিপণন ও ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। এ জাল মূলত অপেশাদার জেলেরা ব্যবহার করে থাকে। এদের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তিনি আরও বলেন, এই অঞ্চলে শুষ্ক মৌসুমে খাল-বিলে পানি থাকে না। বর্ষা মৌসুমে পানি থাকায় খাল-বিল ও জলাশয়ে অপেশাদার জেলেরা সহজ লাভের আশায় এর ব্যবহার করে থাকে। মৎস্য অধিদপ্তর থেকে এই জালের ক্ষতিকর প্রভাব ও ব্যবহার বিষয়ক প্রচারণা কার্যক্রম অব্যাহত আছে।দাকোপ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. বোরহান উদ্দিন মিঠু বলেন, আমরা এসব নিষিদ্ধ জাল ব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি। বিভিন্ন জলাশয় থেকে জাল জব্দ করে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার মাধ্যমে আগুনে পোড়ানো হয়েছে। সব ধরনের নিষিদ্ধ জাল বন্ধে মৎস্যজীবীদেরও সচেতন করে তোলা হবে।
